চুল ভালো রাখার উপায়

index

ডা. দিদারুল আহসান
ত্বক ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ
আলরাজী হাসপাতাল, ফার্মগেট, ঢাকা
চুল পড়া নারীদের একটি অস্বস্তিকর সমস্যা। পুরুষের যেভাবে টাক পড়ে সেভাবে চুল না ঝরে পড়লেও নারীর চুল পাতলা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। আমাদের সমাজে সুন্দর স্বাস্থ্যোজ্জ্বল চুল না হলে মেয়েদের সুন্দরী বা সুশ্রী বলা হয় না। অল্প বয়সে চুল না ঝরে পড়লেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুল পড়ে যাওয়ার সম্মুখীন হন নারীরা। নানা কারণে মেয়েদের চুল পড়তে পারে।
হরমোন
হরমোনের তারতম্যের কারণে চুল পড়া একটি প্রধান সমস্যা। থাইরয়েড হরমোনের তারতম্যের কারণে চুল পড়ে। এ ছাড়া ইস্ট্রোজেনের কারণেও চুল পড়তে পারে। তবে হরমোনজনিত সমস্যায় চিকিৎসা করালে চুল পড়া বন্ধ হয়।
সন্তান জন্মদান
সন্তান জন্মদানের পর তিন মাস নারীর প্রচুর চুল পড়তে পারে। এটিও হরমোনের কারণেই হয়ে থাকে। তবে প্রাকৃতিকভাবেই হরমোন সঠিক মাত্রায় চলে আসার পর চুল পড়া বন্ধ হয়ে যায়। আর চুল পড়ে খুব বেশি পাতলা হয়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন।
রজঃনিবৃত্তি
মাসিক বন্ধ হওয়ার পর মহিলারা চুলের সমস্যায় বেশি ভোগেন। এ সময় প্রায় ৩৭ শতাংশ মহিলার চুল বেশি মাত্রায় ঝরে পড়ে। এ ছাড়া হরমোন থেরাপি নেয়ার কারণেও চুল পড়তে পারে।
নানা ধরনের অসুস্থতার পরও চুল ঝরে যেতে পারে। তবে যে কারণেই চুল ঝরে পড়-ক তার চিকিৎসা করা প্রয়োজন। মহিলাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় চুলের নানা ফ্যাশন যেমন রিবন্ডিং, স্ট্রেইট, পার্ম, ডাই, বে­ায়ার ড্রাই ইত্যাদি করার কারণে চুল ঝরে পড়তে পারে।
এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এ জন্য অনেকে নিজে থেকে ওজন কমানোর জন্য কম খান কিংবা পুষ্টিকর খাবার খান না। এতে করেও চুলের ক্ষতি হয়। ওজন কমাতে খাওয়া বন্ধ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
অল্প বয়সে টাক পড়া
অল্প বয়সে টাক পড়ার নানা কারণ রয়েছে। পুরুষের জন্য এন্ডোজেনিক অ্যালোপেসিয়া শুরু হয় কপালের দু’পাশে রগের কাছে। তারপর ক্রমেই তা বাড়তে বাড়তে সামনে ও চাঁদিতে ছড়িয়ে পড়ে। এটা পুরুষ সেক্স হরমোন টেসটোসটেরন জেনেটিক প্রভাবের কারণে হয়। চুলের বৃদ্ধি অনেকাংশে টেসটোসটেরনের ওপর নির্ভরশীল। চুলের গোড়ায় কিছু রিসেপ্টার থাকে যারা এ হরমোনের উপস্থিতিতে চুলের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে একই মাত্রায় হরমোন থাকা সত্ত্বেও চুলের তারতম্য হয়। এ জন্যই পুরুষের ক্ষেত্রে বয়োসন্ধিকালে সামনের চুল পড়ে যেতে থাকে। অবশ্য চুল পড়ার জন্য থাইরয়েড গ্রন্থির অসুখ, রক্তস্বল্পতা, ওভারির অসুখ, বা অন্য কোনও এন্ডোক্রাইন অসুখও থাকতে পারে। বর্তমানে চুল পড়া বা টাকের আধুনিক চিকিৎসা এসেছে। বাজারে প্রচলিত শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপনে মোহিত না হয়ে অল্প বয়সে চুল পড়া শুরু হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে সঠিক চিকিৎসা নেয়া প্রয়োজন। রূপচর্চার নামে নানা অপ্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহারে ত্বক ও চুলের ক্ষতি হচ্ছে। পরিবেশ দূষণ, বিভিন্ন কেমিক্যালের ক্ষার ও ইনসেকটিসাইড ব্যবহার, পানি দূষণ, বায়ু দূষণ ইত্যাদিও পরোক্ষভাবে চুল পড়ার জন্য দায়ী।
আধুনিক জীবনযাত্রা স্বাভাবিক সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অবশ্য সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এর প্রতিকার আছে। এ চুল পড়া রোধে সারাবিশ্বে বছরে প্রায় ১ বিলিয়নেরও বেশি ডলার খরচ হয়। নানা উপায়ে আমরা চুল পড়া রোধ করতে চাই। অনেক রকমের ইনফেকশন, বিভিন্ন রোগ, ওষুধের ব্যবহার এবং খাদ্যের বিভিন্নতার কারণে সাধারণত চুল পড়ে যায়। কিন্তু গবেষকরা গবেষণার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছেন, ৯৫ ভাগ চুল পড়ার কারণ জিনগত। বাবা কিংবা মা অথবা দু’জনের কাছ থেকে আগত জিনই নির্ধারণ করে দেয় কখন আমাদের চুল পড়বে। এ অবস্থাকে বলা হয় অ্যানড্রোজেনিক অ্যালোপেসিয়া এবং অ্যানড্রোজেন অর্থাৎ পুরুষদের হরমোন এ সমস্যার জন্য দায়ী।
গবেষকরা বিশ্বাস করেন, চুল পড়ার জন্য চুলের গোড়ার বা ফলিকলে একটি এনজাইম তৈরি হয়, যার নাম ফাইভ আলফা রিডাকটেজ। এ এনজাইম রক্তে বাহিত হরমোন টেসটোসটেরনকে ডাই হাইড্রোটেসটোটেরনে পরিণত করে। যার আরেক নাম ডিএইচটি। ডিএইচটি চুলের গোড়ায় আক্রমণ চালায় এবং চুল দুর্বল করে ঝরে পড়তে সাহায্য করে। পুরুষের চুল সাধারণত সামনের দিকে পড়ে এবং টাকে পরিণত হয়। আর মহিলাদের পুরো মাথার চুলই এককভাবে পড়ে এবং পাতলা হয়ে যায়। মহিলাদের শরীরে অ্যারোমাটেজ নামে এক ধরনের এনজাইম তৈরি হয় যা ডিএইচটিকে ইস্ট্রোজেনে পরিণত করে। এতে কিছু হলেও মহিলাদের চুল রক্ষা পায়। চুল পড়ার রাসায়নিক কারণ খুবই জটিল।
চুল পড়া রোধে এবং নতুন চুল গজানোর জন্য মাথায় অনেক সময় নানারকম ভিটামিন ও ভেষজ নির্যাসযুক্ত তেল দেয়া হয়। এ ছাড়া ড্রাকোনিয়ান পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়। এ পদ্ধতিতে চুলের গোড়ায় মৃদু ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়। এতে আবার চুল গজাতে শুরু করে। কিছু কিছু শ্যাম্পু ও জেল ব্যহারে চুল ঘন দেখায়। নানা ভেষজ গুণসম্পন্ন এসব দ্রব্য চুলের গোড়ায় পুষ্টি সরবরাহ করে।
চুলের জন্য ব্যয়বহুল চিকিৎসা গ্রহণের আগেই চুলের যত্নের ব্যাপারে আমাদের সচেতন হতে হবে।
প্রতি একদিন অন্তর চুল শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলা দরকার। অবশ্যই সেই শ্যাম্পু দিয়ে যা আপনার চুলের জন্য উপযোগী। বন্ধু-বান্ধবের কথায় বা চটকদার বিজ্ঞাপনে মুগ্ধ না হয়ে নিজের উপযোগী শ্যাম্পু নিজের পছন্দ করাই ভালো। গবেষকরা জানান, ঘন ঘন শ্যাম্পু করার ফলে চুলের গোড়ায় জমে থাকা সাবান ও তৈলাক্ত পদার্থের মাধ্যমে ডিএইচটি ধুয়ে যায়। আগেই বলা হয়েছে, ডিএইচটি চুল ঝরে পড়াকে ত্বরান্বিত করে থাকে। আবার এভাবে চুল ধোয়ার পর প্রথম দিকে আপনার মনে হতে পারে, চুল বোধ হয় আগের তুলনায় বেশি ঝরে যাচ্ছে। কিন্তু না, শুধু সেই চুলগুলো ঝরে যাচ্ছে, যার গোড়া আলগা হয়ে আছে এবং দুই-একদিনের মধ্যেই ঝরে পড়ত।
ভেজা চুল বেশি অাঁচড়ানো এবং ঘষাঘষির কারণেও চুল বেশি পড়তে পারে। এ ব্যাপারে সাবধান হওয়া দরকার। চুলের স্বাস্থ্যের সঙ্গে শরীর ও মনের স্বাস্থ্যও অনেকাংশে জড়িত। আপনি কেমন খাবার গ্রহণ করেছন, তার ওপরে আপনার চুলের স্বাস্থ্য নির্ভর করে। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় পরিমাণমতো শাকসবজি, ফল যথেষ্ট পরিমাণে রাখতে হবে, অর্থাৎ ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া অতিরিক্ত ডায়েট কন্ট্রোল চুল পড়ার কারণ হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে নিউট্রিশনিস্ট কিংবা ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে। এ ছাড়া মানসিক চাপ এবং অন্যান্য ওষুধ গ্রহণের ফলে চুল ঝরে যাচ্ছে কি না এ ব্যাপারে লক্ষ রেখে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া উচিত।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: