ওজন বাড়াতে আপনার করণীয়

ডা. রাজাশিস চক্রবর্তী
মেডিসিন ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
অনেকেই আছেন যারা ঠিক মতো খাওয়া এবং ব্যায়াম করার পরও সেই রোগাই থেকে যান; ওজন একটুও বাড়ে না।
জিমে ব্যায়াম করে ওজন বাড়াতে গেলে শুধু পেশি বাড়বে, ফ্যাট বাড়বে না- এমন হবে না। পেশির সঙ্গে ফ্যাটও বাড়বে। মোটামুটি ৬০ ভাগ পেশি এবং ৪০ ভাগ ফ্যাট বাড়ে। পরে এ ফ্যাট হাল্কা ব্যায়াম এবং দৌড়িয়ে ঝরিয়ে ফেলতে হয়। বডিবিল্ডাররা এভাবেই দিন দিন ওজন বাড়ান।
অনেক খেলেও যাদের ওজন বাড়ে না, সেটা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক-
যারা খুবই রোগা, অনেক খাওয়ার পরও যাদের ওজন বাড়ে না তাদের বলা হয় হার্ড গেইনার (Hard gainer)- তাদের মেটাবলিজম (সহজ বাংলায় হজমশক্তি) খুব হাই বলে খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বার্ন হয়ে যায়, তাই পুষ্টি গায়ে লাগে না। আবার যারা একটু খেলেই মোটা হয়ে যান (তাদের সংখ্যাই বেশি)- তাদের মেটাবলিজম খুব লো।
মেটাবলিজম নিয়ে যখন কথা উঠেছে, তখন এ নিয়ে কিছু বলা যেতে পারে।
হজমশক্তি সবার এক হয় না। এটা অনেকটাই জন্মগত। তবে খুব হাই বা লো- দুটিই খারাপ। ভালো হল মাঝামাঝি অবস্থানটা।
কিন্তু মেটাবলিজম ভালো করার উপায় কি?
আমাদের শরীর প্রতি ঘণ্টায় একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্যালরি বার্ন করে। সাধারণত কিছু না করা অবস্থায় প্রতি ঘণ্টায় বার্ন করে ৭৫ ক্যালরির মতো। সেই হিসাবে একজন সুস্থ-সবল পরিপূর্ণ বয়স্ক মানুষের দিনে প্রায় ১৮০০ ক্যালরি পরিমাণ খাদ্য দরকার হয়। এখন কথা উঠতে পারে বারবার না খেয়ে একবারই তো ১৮০০ ক্যালরি খেলেই হয়।
মোটেই না! কেননা আমাদের শরীর একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্যালরি প্রহণ করতে পারে। তার বেশি হলে শরীর আপনা আপনিই অতিরিক্ত ক্যালরি ফ্যাট হিসেবে শরীরে জমা করে রাখবে।
বর্তমানে এই ‘নির্দিষ্ট সময়’ বলতে ৩ ঘণ্টার কিছু কম সময়কে ধরা হয়। কেননা একবার খেলে সেটা হজম হতে মোটামুটি আড়াই থেকে ৩ ঘণ্টা লাগার কথা। যেহেতু ঘুমের মধ্যে খাওয়া সম্ভব নয় ঘুম বাদে বাকি সময়টা আমাদের ক্যালরি গ্রহণ করতে হবে।
ধরা যাক, উচ্চতা ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং ১৫০ পাউন্ড বা ৬৭ কেজি ওজনের কেউ আলাদাভাবে যদি শারীরিক পরিশ্রম না করে অর্থাৎ ওজন কমাতেও চান না বা বাড়াতেও চান না, তার দৈনন্দিন খাবারের চাহিদা ১৮০০ ক্যালরি। এখন প্রতি ঘণ্টায় তো ৭৫ ক্যালরি করে খাওয়া সম্ভব নয়। আর একবার খেলে সেটা হজম হতে মোটামুটি আড়াই থেকে ৩ ঘণ্টা লাগার কথা। এই সময়টাতে আপনার শরীরের চাহিদা হবে ৭৫ূ৩=২২৫ ক্যালরি। ঘুমের সময়টা যোগ করে এটাকে ৩০০ ক্যালরি ধরা হল।
তাহলে দেখা যাচ্ছে প্রতি আড়াই-তিন ঘণ্টা করে ৬ বারে ৩০০ ক্যালরি করে খেলে ১৮০০ ক্যালরি পূর্ণ করা সম্ভব।
৩০০ ক্যালরি খাবার ৩ ঘণ্টায় হজম হয়ে গেলে ৩ ঘণ্টা পর একটা সুস্থ-স্বাভাবিক শরীর আবার নতুন খাবারের অপেক্ষায় থাকবে।
এবার শরীরের ম্যাজিক একটু ভালো করে খেয়াল করুন-
মানুষ না খেয়ে থাকলে প্রথমে শরীরে সঞ্চিত চর্বি বার্ন করে শক্তি জোগাবে। ধীরে ধীরে পেশি বার্ন হতে শুরু করবে। এভাবে শরীর ক্ষয় হবে এবং মানুষ দিন দিন রোগা হতে শুরু করবে।
ষ আপনি যদি ৩ ঘণ্টায় ৩০০-এর বদলে ৩০০+ ক্যালরি গ্রহণ করেন তাহলে আপনার শরীর ৩ ঘণ্টায় ৩০০ ক্যালরি বার্ন করে শরীরের শক্তি জোগাবে। বাকি ক্যালরি সোজা ফ্যাট হিসাবে জমা করতে শুরু করবে (ছেলেদের বেলায় তলপেট থেকে এবং মেয়েদের বেলায় নিতম্ব এবং উরু থেকে জমা শুরু হবে)।
ষ আপনি যদি ৩ বার খান, তাহলে গড়ে ৫-৬ ঘণ্টা পর পর ৬০০ ক্যালরি করে খেতে হবে। ৩ ঘণ্টায় ৩০০ ক্যালরি ঠিকমতো হজম হবে, বাকি খাবার হজম না হয়ে ফ্যাট জমতে শুরু করবে এবং পরের ৩ ঘণ্টা শরীর দুর্বল লাগতে শুরু করবে।
ষ শরীর যখন দেখবে আপনি ৩ ঘণ্টা পর আবার খাবার দিচ্ছেন না তখন সে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে শক্তি সঞ্চয় করতে শুরু করবে এবং সেটা ফ্যাট হিসেবে। এভাবে খাওয়া-দাওয়ায় অনিয়মিত হতে শুরু করলে মেটাবলিজমের ১২টা বেজে যাবে।
ষ খাওয়া হজম হওয়া মাত্রই যদি আবার খাবার দেন (৩ ঘণ্টা পর পর) তখন শরীরের আর বাড়তি কষ্ট করে অভ্যন্তরীণ শক্তি সঞ্চয় করতে হবে না অর্থাৎ ফ্যাট জমাবে না। তখন শরীর পুরো দৃষ্টি দেবে আপনার বাহ্যিক কাজের ওপর। মানুষ এ সময়ই ‘কাজ-কর্মে বল’ পায় বলে।
অর্থাৎ হজমশক্তি ভালো রাখতে নিয়মিত অল্প অল্প করে ঘন ঘন খেতে হবে।
কিন্তু কি খাবেন?
অবশ্যই ব্যালান্সড ফুড! অর্থাৎ প্রতিবার খাবারে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট এবং ফ্যাটের সমন্বয় থাকতে হবে। মোটামুটি ৪০ ভাগ প্রোটিন, ৩০ ভাগ কার্ব, ৩০ ভাগ ফ্যাট হতে হবে।
মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, টক দই, লাল চালের ভাত, আটার রুটি, শাকসবজি, ফলমূল ও প্রচুর পানি।
কি খাবেন না?
সাদা ভাত, গোল আলু, ময়দা, সুগার, সোডিয়াম, এলকোহল, ক্যাফেইন, নিকোটিন, প্রসেসড ফুড, ক্যান ফুড, তৈলাক্ত ও মসলাজাতীয় খাবার।
ঘুম কেন জরুরি?
প্রতিদিন ৮-৯ ঘণ্টা বিশ্রাম বা ঘুমাতে পারলে ভালো হয়। কেননা মানুষ ঘুমের মধ্যেই বড় হয়। জিমে গিয়ে শুধু মাসলে পাম্প করা হয়। শরীর পূর্ণ বিশ্রামে থাকার সময়ই পেশিগুলো গ্রো করে।
এতক্ষণ নিশ্চয়ই কিছু সাধারণ ধারণা পেয়েছেন। কিন্তু সব কিছুর সমন্বয় কীভাবে ঘটাবেন, অর্থাৎ ওজনটা বাড়াতে হার্ড গেইনাররা ঠিক কোন পদ্ধতি অবলম্বন করবেন সেটা সংক্ষেপে বলছি-
পদ্ধতিটাকে সোজা বাংলায় বললে, দুই পা সামনে এগুতে হবে, এক পা পিছাতে হবে।
প্রথম দুই সপ্তাহে যত পারেন (কমপক্ষে ২৫০০ ক্যালরি) খাবেন। খুব একটা মেপে খেতে হবে না। তবে প্রোটিনটা যেন যথেষ্ট হয়। প্রতি ২ ঘণ্টা পর পর কিছু না কিছু খাবেন এবং সেই সঙ্গে প্রচুর পানি।
জিমে গিয়ে হার্ড ব্যায়াম করতে হবে। ওয়েট বেশি, রেপস কম। সপ্তাহে ৩ দিন (এক দিন পর পর) ব্যায়াম করবেন। প্রতিটা সেশন ৬০ মিনিট থেকে ৭৫ মিনিটের মধ্যে রাখবেন। কেননা এর পরে শরীর ক্লান্ত হয়ে আসবে। তখন ব্যায়াম চালিয়ে গেলে পেশি ক্ষয় হবে। জিম শুরুর দুই ঘণ্টা আগে খাবেন এবং শেষ হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে অবশ্যই আবার খাবেন। যতটা সম্ভব বিশ্রাম নেবেন, ঘুমাবেন।
প্রথম দিন বুক, পিঠ এবং পেটের ব্যায়াম।
দ্বিতীয় দিন পা এবং পেট।
তৃতীয় দিন কাঁধ, বাহু, পেট।
দুই সপ্তাহ ঠিকমতো সব কিছু অনুসরণ করলে কমপক্ষে এক থেকে দুই কেজি ওজন বাড়বে। কিন্তু এরপর আর যতই খান, আপনার শরীর আর নিতে পারবে না, কেননা আপনার এনাবলিক হরমোন আবার নরমাল পর্যায়ে চলে আসবে। তখন শরীরের বৃদ্ধিও কমে আসবে। তাই পরের সপ্তাহে খাওয়া অনেক কমিয়ে দিতে হবে। ১৩০০-১৫০০ ক্যালরির মতো খাবেন। খাদ্য খুব ক্লিন হতে হবে। ফ্যাট আর কার্ব তুলনামূলকভাবে কম খাবেন।
এই সপ্তাহের জিমের সেশনগুলো এমন হতে পারে-
সেশন ১. বুক, কাঁধ, ট্রাইসেপ, পেট
সেশন ২. পা, পেট
সেশন ৩. পিঠ, বাইসেপ, পেট
খুব হালকা ওয়েট নিয়ে ১০ থেকে ১৫ রেপস্ করে দেবেন। শরীরের ওপর খুব চাপ দেবেন না। কেননা এই সপ্তাহে আপনি খাচ্ছেন কম। এই সপ্তাহটা হবে শরীরের মেইনটেনেন্স পর্ব মাত্র। এ পর্বে শরীর থেকে কিছুটা পানি বেরিয়ে যাবে, তাই একটু হালকা হয়ে যাবেন। একটু ওজন কমে যাবে। এটা দেখে ভেঙে পড়বেন না। কেননা পরের দুই সপ্তাহে বেশি খাবার ও হার্ড ব্যায়ামের ফলে শরীর আবার ফুলতে শুরু করবে। পেটে খাবার পড়া মাত্রই শরীর স্পঞ্জের মতো চুষে নেবে।
এভাবে প্রতি ৩ সপ্তাহে এক-দুই কেজি করে ওজন বাড়বে। এই টেকনিকটা যতদিন না আপনার ওজন পর্যাপ্তের বেশি হচ্ছে ততদিন চালিয়ে যাবেন। ধরুন, আপনার ওজন দরকার ৭০ কেজি, তাহলে ৭৫ কেজি পর্যন্ত বাড়াবেন। তারপর অন্য টেকনিকে ব্যায়াম করে বাকি ৫ কেজি, ফ্যাট ঝরিয়ে ফেলতে হবে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: